বর্তমান বাংলাদেশের চাকরি বাজারে এক ভয়াবহ বৈষম্য ও হতাশার চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা তরুণ-তরুণীরা অবহেলা ও অপমানের শিকার হচ্ছেন।
তাদের প্রকৃত যোগ্যতা যাচাই না করে, শুধুমাত্র অভিজ্ঞতার অজুহাতে চাকরি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। অথচ কোনো কাজের সুযোগ না দিয়েই কীভাবে অভিজ্ঞতা অর্জন সম্ভব, সেই প্রশ্নের জবাব চাকরিদাতাদের কাছে নেই।
সরকারি ও বেসরকারি চাকরির ভাইভা বোর্ডে প্রায়শই দেখা যায়, নতুন প্রার্থীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়। অপ্রাসঙ্গিক ও ব্যঙ্গাত্মক প্রশ্ন করে তাদের হতাশ করা হয় এবং পরিশেষে বলা হয়, “তোমার যোগ্যতা নেই।” এই মনোভাব তরুণদের আত্মবিশ্বাসকে ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং জাতীয়ভাবে মেধা ও সম্ভাবনার অপচয় ঘটছে।
একটি জাতি তখনই দুর্বল হয়ে পড়ে যখন তার শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে মূল্যায়ন করা না হয়। বাস্তবে চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে নতুনদের আবেদন করতে উৎসাহ দেওয়া হলেও, নিয়োগের সময় দেখা যায়, ‘অভিজ্ঞতা নেই’ এই অজুহাতে তাদের বাদ দেওয়া হয়। প্রশ্ন হলো, অভিজ্ঞতার সুযোগ না পেলে দক্ষতা তৈরির পথ কোথায়?
বাংলাদেশে প্রতিবছর লক্ষাধিক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে চাকরি বাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু সেই অনুপাতে চাকরির সুযোগ নেই। প্রতিযোগিতামূলক এই বাজারে তারা যখন একাডেমিক যোগ্যতা নিয়ে এগিয়ে আসে, তখন অভিজ্ঞতার অভাব বা ‘তুমি কিছু পারো না’ জাতীয় মন্তব্যের মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
অনেক সময় ভাইভা বোর্ডে এমন আচরণ করা হয়, যেন তারা কোনো অপরাধী। তাদের আত্মসম্মানে আঘাত করে এমন মন্তব্য করা হয়, যা একজন তরুণের মনোবল একেবারে ভেঙে দিতে যথেষ্ট।
অন্যদিকে, সমাজে দেখা যাচ্ছে অনেক কম শিক্ষিত ব্যক্তি পরিচিতি বা চাতুর্যের জোরে ভালো অবস্থানে চাকরি পাচ্ছেন এবং অধিক আয় করছেন। পক্ষান্তরে, একজন স্নাতকোত্তর পাশ তরুণ মাত্র ১২-১৪ হাজার টাকা বেতনে চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। এটি সমাজে শিক্ষা বিমুখতা, অসন্তোষ এবং বৈষম্যের জন্ম দিচ্ছে।
ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায়, যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ রাজনৈতিক, পারিবারিক বা প্রশাসনিক সুবিধা নিয়ে চাকরি পেয়ে যাচ্ছে, যা প্রকৃত মেধাবীদের জন্য এক মারাত্মক হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই ধরনের বঞ্চনা থেকে অনেক তরুণ বিদেশে পাড়ি জমাতে চায় বা চরম হতাশায় অনৈতিক পথে পা বাড়ায়। এভাবেই দেশীয় চাকরি বাজারে তরুণদের যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায় মেধা পাচার (brain drain) বাড়ছে। এক জরিপ অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ২০ লাখ নতুন কর্মক্ষম মানুষ চাকরি বাজারে প্রবেশ করে, অথচ এর মধ্যে মাত্র ৫-৬ লাখ চাকরি পায়। বাকিরা দীর্ঘ সময় বেকার থেকে যায় কিংবা কর্মজীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। শুধু রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজারের বেশি তরুণ চাকরি খোঁজে, কিন্তু তাদের অধিকাংশই উপযুক্ত কোনো পদ খুঁজে পায় না।
এই বাস্তবতায় কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
প্রথমত, চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে প্রশিক্ষণমূলক পদ (ইন্টার্নশিপ বা এপ্রেন্টিসশিপ) বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে নতুনরা কাজ শেখার সুযোগ পায়।
দ্বিতীয়ত, ভাইভা বোর্ডে থাকা কর্মকর্তাদের জন্য আচরণগত প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা দরকার, যাতে তারা আবেদনকারীদের সম্মান বজায় রেখে মূল্যায়ন করতে পারেন। সেইসঙ্গে যে বিষয়ের ভাইভা নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে বোর্ড সদস্যদের যথেষ্ট জ্ঞান থাকা অপরিহার্য।
এ ছাড়া শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী ন্যায্য বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষিত তরুণরা অবমূল্যায়নের শিকার না হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ চালু করা যেতে পারে, যা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়ক হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত সফট স্কিল ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা। কেবল বক্তৃতা বা কাগুজে নীতিমালায় সীমাবদ্ধ না থেকে এখন প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ।
প্রতিটি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে বুঝতে হবে—আজকের নতুনরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব। নতুনদের সুযোগ দেওয়া মানেই ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্ববান নাগরিক তৈরি করা। তরুণদের অবহেলা নয়, বরং তাদের পাশে দাঁড়ানোই হবে আগামী বাংলাদেশের ভিত্তি। আজকের এই প্রজন্মই একদিন দেশের প্রশাসন, আইন, চিকিৎসা, প্রকৌশল, গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নেতৃত্ব দেবে। তাদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার দায়িত্ব আজ আমাদের সবার।
লেখক
যায়েদুল ইসলাম
আইনজীবী।



