ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত একটি আলোচনা সভা হঠাৎ করেই অরাজকতায় রূপ নিল। আলোচনার বিষয় ছিল মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান—যা দেশের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দলিল। কিন্তু সেই আয়োজন শেষ পর্যন্ত রূপ নিল হেনস্থা,হট্টগোল, হুমকি এবং পুলিশি হস্তক্ষেপে। সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনসহ অন্তত ১১ জনকে অবরুদ্ধ করে রাখার পর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। ঘটনাটির প্রতিটি দিক আমাদের সমাজে ক্রমবর্ধমান অসহনশীলতা ও ‘মব জাস্টিস’-এর প্রবণতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
সভায় অধ্যাপক কার্জন সংবিধান ও স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখছিলেন। তাঁর বক্তব্য শেষ হওয়ার আগেই ‘জুলাই যোদ্ধা’ ব্যানারধারী একদল যুবক প্রবেশ করে স্লোগান দিতে থাকে। তারা ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেন, উপস্থিত অতিথিদের অবরুদ্ধ করেন এবং অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেন। এসময় তাঁদের উপর যেভাবে চড়াও হয়েছে উত্তেজিত জনতা তা মোটেই কাম্য নয়। যদি তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে তাহলে তাদেরকে আটক করার দায়িত্ব পুলিশের। কিন্তু পাবলিক প্লেসে এভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষকদের হেনস্তা করা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য গভীর লজ্জার।
জনপরিসরে কারও বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া যদি হয় ভাঙচুর, হুমকি বা দমন, তবে তা গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক ভিত্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আমরা ভুলে যাচ্ছি, বিতর্ক থাকতেই পারে, কিন্তু বিতর্কের প্রতিকার কখনোই মব জাস্টিস হতে পারে না।
মব জাস্টিস বা জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি আমাদের সমাজে নতুন নয়। তবে শিক্ষাবিদ, মুক্তিযোদ্ধাদের মতো জনপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু বানানো এ প্রবণতাকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। এতে কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতাই ক্ষুণ্ন হচ্ছে না, বরং প্রজন্মের কাছে বার্তা যাচ্ছে যে অরাজকতা ও ভীতি প্রদর্শনই মতভেদের একমাত্র সমাধান।
রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হলো, এ ধরনের পরিস্থিতি ঠেকানো এবং সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সমানভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিগুলোরও দায়িত্ব আছে সহনশীলতার চর্চা বাড়ানোর। মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান বা রাজনীতি—এসব বিষয়ে বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া হতে হবে যুক্তি ও পাল্টা যুক্তি, কখনোই ভয় বা হেনস্তা নয়।



