বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলে না। তবু বিশ্বকাপ এলেই দেশজুড়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম আবহ। বাড়ির ছাদে বিশাল পতাকা, রাতভর খেলা দেখা, প্রিয় দলের জার্সি পরে উল্লাস সব মিলিয়ে ফুটবল যেন একটি সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়। এই আবেগ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বাস্তবতারই অংশ। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও একাধিকবার বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল-প্রেমকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। তবে এই উৎসবের একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে ,যখন খেলা নিয়ে আনন্দের বদলে বিভাজন, বিদ্বেষ ও সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এবারের বিশ্বকাপেও সেই চিত্রের পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। ফাইনাল ও নকআউট পর্বকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা, তর্ক-বিতর্ক ও সংঘর্ষের খবর গণমাধ্যমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটূক্তি, বিদ্বেষপূর্ণ পোস্ট এবং প্রতিপক্ষের সমর্থকদের অপমান করার প্রবণতা পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি। এমনকি সংঘর্ষে নিহত ও আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
আসলে এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। ২০২২ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে পরিচালিত একটি একাডেমিক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে বিশ্বকাপ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এসব মৃত্যুর কারণ ছিল সমর্থকদের সংঘর্ষ, পতাকা টানাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, খেলা দেখার সময় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়া এবং অন্যান্য দুর্ঘটনা।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যেসব দেশের জন্য আমরা এত আবেগে বিভোর, সেই আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল বা স্পেনের খেলোয়াড়েরা মাঠে লড়াই শেষে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন, করমর্দন করেন, জার্সি বিনিময় করেন। অথচ হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসে বাংলাদেশের কিছু সমর্থক বন্ধুত্ব ভেঙে ফেলেন, আত্মীয়তার সম্পর্কে ফাটল ধরান, এমনকি কখনো কখনো সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়েন।
মানুষ যখন একটি দলকে নিজের পরিচয়ের অংশ বানিয়ে ফেলে, তখন সেই দলের হারকে ব্যক্তিগত অপমান এবং সমালোচনাকে নিজের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে নিতে শুরু করে। এটি এক ধরণের মনস্তত্ব। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও উসকে দেয়। লাইক, শেয়ার, ট্রল, কমেন্ট ও মিমে সেই আক্রমণ অতি বেড়ে যাওয়ায় ঘটে যায় অঘটন।
কিন্তু ফুটবল তো বিভাজনের ভাষা শেখায় না। ফুটবল শেখায় শৃঙ্খলা, দলগত চেতনা, প্রতিপক্ষকে সম্মান করা এবং হার-জিতকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা। একজন খেলোয়াড় জানেন, আজ তিনি জিতবেন, কাল হারবেন। কিন্তু একজন সমর্থক যদি একটি ম্যাচের ফলকে নিজের অহংকারের প্রশ্ন বানিয়ে ফেলেন, তাহলে তিনি খেলার চেতনাকে ধারণ করছেন না।
আমাদের পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সন্তানদের যদি শেখানো হয়, প্রতিপক্ষকে অপমান করাই সমর্থনের প্রমাণ, তাহলে আমরা সুস্থ ক্রীড়াপ্রেমী নয়, বরং অসহিষ্ণু সমর্থক তৈরি করব। মতের ভিন্নতা গ্রহণ করার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও খেলাধুলার শিক্ষার অংশ।
মেসি, ইয়ামাল, ভিনিসিয়ুস বা এমবাপ্পে—তাঁদের কেউই জানেন না, বাংলাদেশের কোনো গ্রামে বা শহরে তাঁদের সমর্থন করতে গিয়ে দুই বন্ধুর সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে কিংবা একটি পরিবার বিভক্ত হয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষতি আমাদের সমাজকেই বহন করতে হয়।
বিশ্বকাপের ট্রফি একদিন কোনো একটি দলের হাতে উঠবে। কয়েক সপ্তাহ পর উৎসবের রেশও মিলিয়ে যাবে। কিন্তু একটি ভাঙা সম্পর্ক, একটি সামাজিক বিভাজন কিংবা একটি হারিয়ে যাওয়া প্রাণ কোনো ট্রফি ফিরিয়ে দিতে পারে না।
খেলাকে খেলাই থাকতে দিন। সমর্থন হোক আবেগের কিন্তু আচরণ যেন সীমা অতিক্রম করে না যায়। তাহলে ক্ষতি আমাদেরই হয়। কেউ না কেউ আপনাকে অনুসরণ করে। আপনার ঘৃণ্য আচরণ সমাজে কোন না কোন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ফেলে।



