বাবা-মা বার্ধক্যে পৌঁছালে তাঁদের সেবাযত্ন ও দেখভাল করা প্রত্যেক সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় অনেক মা-বাবাই শেষ বয়সে এসে চরম অবহেলা ও কষ্টে জীবনযাপন করেন। সন্তানদের সুখের কথা চিন্তা করে অনেক সময় মুখ বুজে সব সহ্য করলেও, আমাদের দেশে প্রবীণ মা-বাবার অধিকার সুরক্ষায় রয়েছে কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতা। দেশে ‘পিতামাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩’ এবং এর অধীনে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ বিধিমালা ২০২৩’ কার্যকর থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এই আইনটি সম্পর্কে সচেতনতা এখনো অনেক কম।
আইনে কী বলা আছে?
মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা এবং তাঁদের সঙ্গে সন্তানের বসবাস বাধ্যতামূলক করার বিধান রেখে সরকার ২০১৩ সালে এই আইনটি প্রণয়ন করে। আইনের ৩ ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে তাঁর মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে এই দায়িত্ব বণ্টন করে নেবেন।
আইনের অন্যতম প্রধান দিক হলো, কোনো সন্তানই তাঁর মা-বাবাকে (কিংবা উভয়কে) তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোথাও আলাদাভাবে বাস করতে বাধ্য করতে পারবেন না। সন্তানদের নিয়মিত মা-বাবার স্বাস্থ্য সম্পর্কে খোঁজখবর রাখা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া এবং পরিচর্যা করা বাধ্যতামূলক। শুধু তা-ই নয়, মা-বাবাকে নিয়মিত সময় বা সঙ্গ দেওয়ার কথাও আইনে উল্লেখ রয়েছে।
আয়ের অংশ দেওয়া ও সহযোগীদের শাস্তি
যদি কোনো মা-বাবা সন্তানদের সঙ্গে না থেকে আলাদা বসবাস করেন, তবে আইনের ৩(৭) ধারা অনুযায়ী, প্রত্যেক সন্তানকে তাঁর প্রতিদিনের আয়, মাসিক বা বার্ষিক আয় থেকে একটি যুক্তিসংগত পরিমাণ অর্থ নিয়মিত মা-বাবাকে দিতে হবে।
আইনটিতে আরও বলা হয়েছে, সন্তানের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যদি বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি সন্তানকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেন বা উসকানি দেন, তবে তাঁরাও সমান অপরাধে অপরাধী হবেন এবং তাঁদেরও শাস্তির আওতায় আনা যাবে।
আইন অমান্য করলে শাস্তি ও বিচার প্রক্রিয়া
পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩-এর ৫(১) ধারা অনুযায়ী, কোনো সন্তান যদি মা-বাবার ভরণপোষণ না করেন এবং সেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা, আর তা অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধের বিচার হবে প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে। তবে আদালত সরাসরি কোনো মামলা আমলে নিতে পারবেন না; এর জন্য ভুক্তভোগী পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগের প্রয়োজন হবে। অবশ্য আইনে শুরুতেই কঠোর শাস্তির দিকে না গিয়ে আপস-নিষ্পত্তির মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের সুযোগ বা ধারা রাখা হয়েছে। আইনি কঠোরতা থাকলেও আমাদের দেশে সামাজিক লোকলজ্জার কারণে মা-বাবারা সাধারণত সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন না, ফলে এই আইনের ব্যবহার এখনো বেশ কম।
সন্তান বেঁচে না থাকলে বা অক্ষম হলে কী হবে?
২০১৩ সালের মূল আইনটিকে আরও সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর করতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ বিধিমালা ২০২৩’ তৈরি করেছে। এই বিধিমালায় কিছু বিশেষ পরিস্থিতির সমাধান দেওয়া হয়েছে।
কোনো সন্তান যদি অত্যন্ত অসচ্ছলতার কারণে বা কোনো যুক্তিসংগত কারণে মা-বাবাকে নিজের কাছে রেখে ভরণপোষণ করতে না পারেন, তবে বিধিমালা অনুযায়ী সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত ‘পরিচর্যাকেন্দ্রে’ রেখে তাঁদের দেখাশোনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
আবার যদি মা-বাবার কোনো সন্তান জীবিত না থাকেন, কিংবা দেখাশোনা করার মতো কোনো আত্মীয় না থাকে, তবে সরকারি ‘পিতা-মাতা ভরণপোষণ কমিটি’ নিজ দায়িত্বে তাঁদের পরিচর্যাকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এছাড়া অসহায় ও দুস্থ মা-বাবার সহায়তার জন্য সরকারি অনুদান এবং দেশি-বিদেশি সহায়তার সমন্বয়ে একটি ‘ভরণপোষণ তহবিল’ গঠনের রূপরেখাও এই বিধিমালায় যুক্ত করা হয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, কেবল আইন দিয়ে নয়, বরং নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা এবং এই আইনের সঠিক প্রচারের মাধ্যমেই প্রবীণ মা-বাবার শেষ বয়সের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা সম্ভব।



