বাংলাদেশে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা—সব স্তরেই আমরা প্রায়শই মানহীনতার অভিযোগ শুনি। কিন্তু এই সমস্যার শেকড় কোথায়? পাঠ্যক্রম, অবকাঠামো, নাকি শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহ? বাস্তবতা হলো, সমস্যার মূল নিহিত রয়েছে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তাদের নির্বাচনের প্রক্রিয়াই যদি ঘুণে ধরা হয়, তবে সেই সমাজের পচন শুরু হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
প্রথমত, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে প্রভাব, সুপারিশ ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি বহুদিন ধরেই আলোচিত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রকৃত মেধাবী প্রার্থীরা উপেক্ষিত হয়ে যাচ্ছেন, আর সুযোগ পাচ্ছেন এমন ব্যক্তিরা, যাদের একমাত্র যোগ্যতা হলো ‘ঠিক জায়গায় যোগাযোগ’। এই প্রবণতা শুধু একটি ব্যক্তিকে নয়, বরং পুরো প্রজন্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একজন অযোগ্য শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন, তখন তিনি শুধু পাঠদানেই ব্যর্থ হন না; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভুল ধারণা, অনুপ্রেরণার অভাব এবং নৈতিক অবক্ষয়ও তৈরি করেন।
দ্বিতীয়ত, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার অভাব একটি বড় সমস্যা। লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা কিংবা প্র্যাকটিক্যাল মূল্যায়ন—সব ক্ষেত্রেই প্রশ্ন উঠছে। অনেক সময় ফলাফল প্রকাশে অস্বচ্ছতা, নম্বর প্রদানে বৈষম্য কিংবা নির্দিষ্ট প্রার্থীদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে। ফলে প্রার্থীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয় এবং একটি সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়।
তৃতীয়ত, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতার মূল্যায়নকে প্রায়শই গুরুত্ব দেওয়া হয় না। একজন ভালো শিক্ষক হওয়ার জন্য শুধুমাত্র একাডেমিক ফলাফল যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শিক্ষাদানের দক্ষতা, মনস্তাত্ত্বিক বোঝাপড়া এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের সক্ষমতা। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এই বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থাকে। ফলে যারা শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হন, তাদের অনেকেই শ্রেণিকক্ষে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন না।
এই সমস্যার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক প্রভাব। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যখন রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে চলে যায়, তখন সেখানে যোগ্যতার পরিবর্তে আনুগত্যই প্রধান বিবেচ্য হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বাতন্ত্র্য হারায় এবং শিক্ষার পরিবেশ ক্রমশ দূষিত হয়ে ওঠে।
একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেন না; তিনি একজন শিক্ষার্থীর নৈতিকতা, চিন্তাভাবনা এবং জীবনদৃষ্টিকে প্রভাবিত করেন। তাই শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সামান্য দুর্নীতিও বহুগুণে সমাজে প্রতিফলিত হয়। আজ আমরা যখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং নৈতিক অবক্ষয় দেখি, তখন তার একটি বড় অংশের সূত্রপাত ঘটে শিক্ষা ব্যবস্থার এই দুর্বল ভিত্তি থেকে।
সমস্যার সমাধান কী?
প্রথমত, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। লিখিত পরীক্ষা থেকে শুরু করে মৌখিক মূল্যায়ন—সব কিছু ডিজিটাল রেকর্ডের আওতায় আনতে হবে, যাতে কোনো ধরনের কারসাজির সুযোগ না থাকে।
দ্বিতীয়ত, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নিয়োগ কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যারা শুধুমাত্র শিক্ষকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে এবং যাদের ওপর কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ থাকবে না।
তৃতীয়ত, শিক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্র্যাকটিক্যাল ডেমোনস্ট্রেশন বা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সক্ষমতা যাচাই বাধ্যতামূলক করা উচিত। এতে বোঝা যাবে একজন প্রার্থী বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে শিক্ষা দিতে পারেন। পাশাপাশি নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার মাধ্যমে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে।
চতুর্থত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এটি শুধু শাস্তির জন্য নয়, বরং একটি শক্তিশালী বার্তা দেওয়ার জন্য প্রয়োজন—যে শিক্ষা খাতে দুর্নীতি কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।
সবশেষে, আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা; এটি কেবল চাকরি নয়, এটি একটি দায়িত্ব। এই উপলব্ধি সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিক্ষকতার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তিকে মজবুত করতে পারব। আর সেই ভিত্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো শিক্ষক। যদি এই স্তম্ভ দুর্বল হয়, তবে পুরো কাঠামোই একসময় ভেঙে পড়বে।
তাই সময় এসেছে প্রশ্ন করার—আমরা কি সত্যিই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যোগ্য শিক্ষক তৈরি করছি? নাকি ঘুণে ধরা একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজেদের ভিত্তিকে নষ্ট করে দিচ্ছি? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামী দিনের পথচলা।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি



