বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কেবিনেটে না নিয়ে বাইরে আলোচনা করে নেওয়া হতো বলে জানিয়েছেন সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। দায়িত্ব ছাড়ার পর এক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কেবিনেটে যেসব বিষয়ে মতভেদ হতো, সেগুলো সাধারণত ছোটখাটো বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকত। “আমরা যারা দ্বিমত পোষণ করেছি, সেগুলো সূচি থেকে বাদ দেওয়া বা এ ধরনের ছোট বিষয়ে ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বড় সিদ্ধান্তগুলো কেবিনেটে হতো না, সেগুলো কেবিনেটের বাইরে আলোচনা হতো,” বলেন তিনি।
তিনি আরও জানান, সব সরকারেরই একটি ‘কিচেন কেবিনেট’ থাকে বলে শুনেছেন। তবে সেখানে কারা ছিলেন, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন। “আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমি সেখানে ছিলাম না। হয়তো তারা ভেবেছে, আমি তাদের সঙ্গে একমত হব না,” বলেন তিনি। যারা এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তারা তার পরিচিত ও সহকর্মী ছিলেন বলেও উল্লেখ করেন সাবেক এই উপদেষ্টা।
পুলিশ পুনর্গঠন ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পুলিশের পুনর্গঠনই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। সে সময় বহু থানা লুট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছিল এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। অনেক পুলিশ সদস্য মাঠে নামতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন।
তিনি বলেন, পুলিশের দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনা করে বোঝাপড়ার মাধ্যমে তাদের মাঠে নামানো হয়। ট্রাফিক পুলিশও দায়িত্ব পালনে অনাগ্রহ দেখিয়েছিল, তাদেরও উৎসাহিত করা হয়।
সাখাওয়াত হোসেন জানান, সে সময় প্রায় চার হাজার রাইফেল লুট হয়েছিল। এর মধ্যে কিছু উদ্ধার হলেও এক হাজারের বেশি রাইফেল ও পিস্তল নিখোঁজ ছিল। এসব অস্ত্র বর্তমান সরকারের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দায়িত্ব ছাড়ার কারণ
কেন তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল—এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি বক্তব্য খণ্ডিতভাবে প্রচার হওয়ায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়। “আমি যে প্রেক্ষাপটে কথা বলেছিলাম, তা সেভাবে উপস্থাপিত হয়নি। এখন দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতি তখনকার চেয়েও খারাপ হয়েছে,” বলেন তিনি।
নিজে দায়িত্ব ছাড়তে চাইলেও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তাকে তাৎক্ষণিকভাবে সরে যেতে দেননি বলেও জানান তিনি। “৭-৮ দিনের মধ্যে চলে গেলে খারাপ বার্তা যাবে—এই যুক্তিতে আমাকে থাকতে বলা হয়েছিল,” বলেন সাখাওয়াত হোসেন।
৭.৬২ বুলেট ও অস্ত্র বিতর্ক
৭.৬২ ক্যালিবারের বুলেট ও চাইনিজ টাইপ-৩৯ রাইফেল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টির এখনো সুরাহা হয়নি। আনসার সদস্যদের ওপর হামলার একটি ভিডিওতে কিছু ব্যক্তিকে পুলিশের রাইফেল ব্যবহার করতে দেখা গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অস্ত্র সমরাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং সাধারণত পুলিশের কাছে থাকার কথা নয়। কবে ও কেন এসব অস্ত্র পুলিশের কাছে দেওয়া হয়েছিল, তা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন ছিল। তবে দায়িত্বে না থাকায় তিনি সে উদ্যোগ নিতে পারেননি।
তিনি আরও দাবি করেন, তার কাছে কিছু সন্দেহজনক ছবি রয়েছে, যেখানে কয়েকজনের চেহারা স্থানীয়দের মতো নয় বলে মনে হয়েছে। কয়েকজনকে হেলিকপ্টারে ওঠাতেও দেখা গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
নির্বাচন নিয়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কোনো দেশেই শতভাগ নিখুঁত নির্বাচন হয় না। “আমাদের দেশেও টানা তিনটি নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এবারকার নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৭৭টি আসন পেয়েছে, যা দেশের রাজনীতিতে একটি বড় ঘটনা,” বলেন তিনি।
চুক্তি, বিনিয়োগ ও বিদেশি প্রভাব
বিভিন্ন চুক্তি নিয়ে তিনি বলেন, কোনো গোপন চুক্তি হয়নি। এসব চুক্তি সাধারণত বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও পিপিপি অথরিটির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। চুক্তিতে ‘নন-ডিসক্লোজার ক্লজ’ থাকায় সব তথ্য প্রকাশ করা যায় না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
একটি আমেরিকান কোম্পানির শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের ৫ শতাংশ নিয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তার মতবিরোধ হয়েছিল বলে জানান সাখাওয়াত হোসেন।
বিদেশি প্রভাবের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সব ক্ষেত্রে নয়, তবে কিছু বিষয়ে চাপ ছিল—বিশেষ করে বাণিজ্য আলোচনায়। আগের সময়ে নীতিনির্ধারণ অনেকটাই দিল্লিকেন্দ্রিক ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পেছনেও এ ধরনের প্রভাব ছিল বলে ইঙ্গিত দেন সাবেক এই উপদেষ্টা।



